বাইরে এখন রাজার মতো মে-দিন আসে…

©️ মধুবন্তী মিত্র

 

লকডাউনের বাজারে ছুটির কথা মাথায় আসছে না কারোরই। কী ছুটি আর কী কাজ? work from home এর জেরে সবারই দৈনন্দিন রুটিনে কম-বেশী পরিবর্তন এসেছে। তাই গুলিয়ে যাচ্ছে ছুটির দিনের হিসেব। এরই মধ্যে নিঃশব্দে চলে এল এবং চলে গেল মে-দিবস। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে ‘রাজার মতো’ আসা মে-দিবসের কথা লিখেছেন — আমাদের প্রজন্মের প্রায় কেউই তেমনটা হতে দেখেননি। রাজনৈতিক দলগুলি যেখানে যেখানে মে দিবস পালন করেছে, সেখানকার মানুষ তবু খানিকটা ওয়াকিবহাল। বাকিদের ক্ষেত্রে মে-দিবস আরেকটা ছুটির দিন।


মে-দিবসের ইতিহাস

আমরা collective amnesia-র বিরুদ্ধে লড়াই করছি প্রতিদিন। ধনতন্ত্র বিশ্বজুড়ে যে ইতিহাস বিকৃতি এবং সমষ্টিগত স্মৃতিলোপের পৃষ্ঠপোষণ করছে চুপিসারে, তার এক বৃহত্তম ফসল হল এই মে-দিবসের ইতিহাস বিস্মরণ। যেমনভাবে, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসের মূল সংজ্ঞা জনমানসে বদলে দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণ এবং পণ্যায়নের চর্চার মধ্যে দিয়ে, আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের আবেগের নীচে চাপা পড়ে গেছে বাংলাদেশের চাকমা প্রভৃতি জাতির ওপর বাংলাভাষার আগ্রাসনের সমান্তরাল কাহিনী, তেমনভাবেই মে-দিবসের ইতিহাস তলিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে।

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে শ্রমজীবী মানুষ ১২-১৬ ঘন্টার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং কর্মীসুরক্ষার অপ্রতুলতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। 1860-র দশকে দানা বাঁধে মনুষ্যেতর কর্মস্থল এবং অতিরিক্ত দীর্ঘ কর্মঘণ্টা(working hours)-র  বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। 1880-র দশকে এই বিক্ষোভ সংগঠিত হয় এবং ৮ ঘন্টার শ্রমদিন চালু করার দাবী তোলেন শ্রমজীবী মানুষ। এবং ঘটনাটি ঘটে খোদ আমেরিকায়। আজ্ঞে হ্যাঁ — মাইক্রোসফট যতটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই ওতপ্রোতভাবে আমেরিকার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম। ধনতন্ত্রের দাদাগিরিতে এগিয়ে থাকা দেশ আমেরিকার বুকে সেই ঊনিশ শতকের শেষ দিকে অগুন্তি শ্রমিক বুকের রক্ত ঝরিয়েছিল শ্রমের অধিকারের ভিত্তি মজবুত করতে।

আমেরিকার তৎকালীন Federation of Organized Trades and Labor Unions — যা পরে American Federation of Labor নামে পরিচিত হয় — তাদের Chicago Convention (1884)-এ ঘোষণা করেন 1886 খ্রীষ্টাব্দের পয়লা মে থেকে আইনত আট-ঘন্টার শ্রমদিন চালু করা হবে। এই দাবীর সমর্থনে সারা আমেরিকা জুড়ে চলল বিক্ষোভ প্রদর্শন, হরতাল, মিছিল, জমায়েত। শিকাগো শহরের অগণিত শ্রমজীবী মানুষ যোগ দিলেন এই আন্দোলনে। সময় কমানোর লড়াই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল বৃহত্তর লড়াই। তাদের ইস্তেহারে লেখা হল:

War to the Palace, Peace to the Cottage, and Death to LUXURIOUS IDLENESS.

প্রাসাদে আঘাত হানো, কুটিরে আসুক শান্তি, এবং প্রাচুর্যময় আলস্যের মৃত্যু হোক।

যথারীতি আমেরিকার শ্রমিক সঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী 1886 খ্রীষ্টাব্দের পয়লা মে, তামাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ হাজার কর্মস্থল থেকে তিন লক্ষেরও বেশী শ্রমিক কাজে না গিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম শ্রমদিবস উদযাপনে যোগদান করলেন। শিকাগো শহরে ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ হরতাল ঘোষণা করলেন, বিক্ষোভ প্রদর্শন চলল — কোনও হিংসাত্মক পন্থা নয়, কেবল মানুষের অধিকারের জন্য অহিংস, নিরস্ত্র লড়াই। বিক্ষোভকারীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এক লক্ষে পৌঁছাল তেসরা মে। ধনতন্ত্রের গোড়ায় পড়ল আঘাত। নেমে এল দমননীতি। পুলিশ হিংস্র হয়ে উঠল। শুরু হল ধড়পাকড়। ইস্পাত কারখানার শ্রমিকরা যারা পিকেটিং করেছিলেন, তাদের ওপর শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার, নির্দয় মারধোর। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে যে কোনওরকম প্রতিরোধের জবাবে পুলিশ গুলি চালায়। মারা যান দুজন বিক্ষোভকারী, আহত হন অগুন্তি।

চৌঠা মে, 1886, অত্যাচারিত বিক্ষোভকারীদের সভা হয় হেমার্কেট স্কোয়্যারে। বিষয়: পুলিশি অত্যাচার এবং নৃশংসতা। সেই সভায় আলোচনা চলাকালীন এসে পড়ে পুলিশবাহিনী। উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে (যা পরে অস্বীকার করেন স্বয়ং মেয়র) জমায়েত তুলে দেওয়া হয়। সেই সময় সভাস্থলে একটি বোমা পড়ে। সেই ঘটনায় উত্তেজিত পুলিশ গুলি চালায় নিরস্ত্র জনতার উপর। আট জন নাগরিকের মৃত্যু হয়, জখম হন প্রায় ৪০ জন। এই ঘটনার জেরে গ্রেপ্তার করা হয় আটজন শ্রমিক নেতাকে। এদের মধ্যে সবাই ঘটনার দিন উপস্থিত পর্যন্ত ছিলেন না। সংগঠিত হয় এক অদ্ভুত বিচারব্যবস্থা — বিচারপতিরা প্রত্যেকেই ছিলেন পেশায় শিল্পপতি এবং তাদের শ্রেণীশত্রু এই শ্রমিকনেতাদের এক প্রহসনমূলক বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

হেমার্কেটের শহীদ মিনারে খোদাই হয়:

THE DAY WILL COME WHEN OUR SILENCE WILL BE MORE POWERFUL THAN THE VOICES YOU ARE THROTTLING TODAY.


মে-দিবস আপনারও

বহু, বহু প্রাণ এবং আন্দোলনের বিনিময়ে অর্জিত আট-ঘন্টার শ্রমদিনের এই ইতিহাস বেশ কৌশলে জনমানস থেকে মুছে দিয়েছে ধনতন্ত্র। ধনতন্ত্র বলেছে, কাজ করতে। কারণ কাজ করলে টাকা হবে। এবং টাকা হলে আপনার সামাজিক মর্যাদা বাড়বে, আপনি অনেক অনেক Veblen good কিনবেন, এবং পারতপক্ষে ধনতন্ত্রের হাত শক্ত করবেন।

এবং ক্কচিৎ কদাচিত যদি কেউ আপনার কানের সামনে গুণগুণ করে আপনাকে মনে করিয়ে দেয় শ্রমদিবসের ইতিহাস, আপনার শ্রমিক সত্তার কাছে আর্জি জানায় এই ধনতন্ত্রের বিষাক্ত চক্রের অংশীদার না হয়ে ওঠার জন্য — তখন যদি আপনার সুপ্ত বিবেক জেগে ওঠে? তখন?

ধনতন্ত্র ঘাবড়ায়নি। সে সুরাহা করে রেখেছে। তার দৌলতে আপনি আজ আত্মবিস্মৃত। ধনতন্ত্রের দাপাদাপিতে ইতিহাস বিস্মৃত শ্রমিক নিজেকে শ্রমিক বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। চাকুরিজীবী বৌদ্ধিকশ্রমদানকারীদের ধনতন্ত্র উপহার দিয়েছে ‘designation’, পদমর্যাদা। আপনাকে ধনতন্ত্র ‘employee’ বলে এবং দিনের পর দিন বোঝায় আপনি কায়িক শ্রমদানকারী নন, অতএব শ্রমিক নন, ‘management’-এর খাস লোক। সেই পরিচয়ে গদগদ হয়ে আপনি বিস্মৃত হন আত্মপরিচয়, নিজের অধিকার ভুলে যান, ভুলে যান ইতিহাস। এবং মে-দিবসে ছুটি পেলে মজা করে পাশের ‘employee’ কে বলেন, “আমরা তো লেবার। তাই ছুটি দিয়েছে। আরে হো হো হো হো। আরে হা হা হা।”

আর নিঃশব্দে মুখ টিপে হাসে ধনতন্ত্র। আপনার ময়ূরপুচ্ছের পিছনে কালো, খেটে খাওয়া, মজবুত কাকের শরীরটার দিকে তাকিয়ে সে হেসে নেয় একচোট…


উল্লেখ:

  1. The Brief Origins of May Day
  2. Haymarket affair

(আপনিও আপনার লেখা দিতে পারেন আমায়ে: বিস্তারিত জানতে দেখুন Guests Posts পাতাটি।)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s